ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলজুড়ে হুতিদের অগ্রাভিযান অনেককে অবাক করেছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি গত বৃহস্পতিবার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের বন্দরনগরী মোখা দখল করে নেয়। এত দিন বন্দরটি ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।

ইয়েমেনের সরকারি কর্মকর্তারা গতকাল শুক্রবার মার্কিন সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) জানিয়েছেন, হুতি বাহিনী পেরিমও দখল করেছে। ময়উন নামে পরিচিত এ ছোট দ্বীপ কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির ঠিক ভেতরে অবস্থিত। জবাবে সৌদি আরব মোখা বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে।

পেরিম দ্বীপ দখলের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত পরিস্থিতিও দ্রুত বদলে গেছে। বাব আল-মানদেব হলো, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যকার সরু প্রবেশপথ। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।

আরব উপদ্বীপের অন্য প্রান্তে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এরই মধ্যে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে জ্বালানি তেল রপ্তানির জন্য সৌদি আরব ক্রমেই লোহিত সাগরের নৌপথের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এখন বাব আল–মানদেব প্রণালির ওপর হুতিরা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করায় বৈশ্বিক তেলের বাজার চরম ঝুঁকিতে পড়ল।

লোহিত সাগরের গোটা ইয়েমেন উপকূল ও বাব আল–মানদেব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানকে বেশ সুবিধাজনক অবস্থান পাইয়ে দেওয়া এ বিদ্রোহী আসলে কারা জেনে নেওয়া যাক—

হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশটির বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে তারা।

২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে। এ অভিযানে সৌদিকে সমর্থন দেয় পশ্চিমারা। সামরিক জোট ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান ও স্থল হামলা শুরু করে। তবে তারা শেষ পর্যন্ত ইরান-সমর্থিত হুতিদের পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়। গোষ্ঠীটির আবির্ভাব ঘটে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে। তবে তারা প্রথমবারের মতো দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে ২০১৪ সালে। সে সময় তারা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে। দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদরাব্বু মনসুর হাদিকে তারা ইয়েমেন ছেড়ে পালাতে বাধ্য করে।

২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে। এ অভিযানে সৌদিকে সমর্থন দেয় পশ্চিমারা। সামরিক জোট ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান ও স্থল হামলা শুরু করে। তবে তারা শেষ পর্যন্ত ইরান-সমর্থিত হুতিদের পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে ইয়েমেনে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপর ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে শান্তি আলোচনা চলছিল।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা চালায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। জবাবে সেদিন থেকেই গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে সমর্থন দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

গাজায় ইসরায়েলি বর্বরতার প্রতিবাদে এবং ফিলিস্তিন ও হামাসের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে লোহিত সাগরে চলাচলকারী ইসরায়েল–সংশ্লিষ্ট জাহাজ নিশানা করে হামলা শুরু করে হুতিরা।

গত ১৯ জানুয়ারি গাজায় প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর হুতিরা জাহাজ নিশানা করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করে দেয়।

যে কারণে ইরান যুদ্ধে হুতিরা এরই মধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আকস্মিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায় ইরান।

ট্রাম্পের নেতৃত্বে হুতিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত ব্যর্থতার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ হয়ে থাকবে। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। অন্যদিকে হুতিরা আরও শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর এক পর্যায়ে তেহরানের অনুরোধে হুতিরা মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, হামলা চালায় দক্ষিণ ইসরায়েলে। এভাবে ইরান যুদ্ধে হুতিদের অংশগ্রহণ করার পেছনে সুস্পষ্ট একটি কৌশলগত সামরিক কারণ রয়েছে। লোহিত সাগর ও বাব আল–মানদেব প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানবাহী রণতরিগুলোর অবাধ চলাচল ব্যাহত করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে।

এখন, বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে কড়া পদক্ষেপ নেন বা পারস্য উপসাগরে আকাশ, নৌ ও স্থলপথে বড় ধরনের কোনো অভিযান চালান, তবে সেটি শুরুতেই নস্যাৎ করা হুতিদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোটের সাহায্যে বড় আকারের নৌযানের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। তা ছাড়া সাগরের বুকে মাইন পেতে রেখে বাব আল–মানদেব প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচলকেও তারা প্রবলভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনায় হামলার পর আগুন জ্বলছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনায় হামলার পর আগুন জ্বলছেফাইল ছবি: রয়টার্স হুতিদের এসব সক্ষমতা ইরান যুদ্ধে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ চলাচলের পথকে রীতিমতো কণ্টকাকীর্ণ ও সময়সাপেক্ষ করে তুলতে পারে। মার্কিন রণতরিগুলো চাইলে অবশ্য সৌদি আরবের উপকূল ঘেঁষে লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চল থেকে নিজেদের অভিযান চালাতে পারে। তবে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ওই এলাকা পর্যন্ত গিয়েও অনায়াস আঘাত হানতে সক্ষম। পাশাপাশি সৌদি উপকূল থেকে হরমুজ প্রণালির এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব মার্কিন বাহিনীর জন্য আরেক বড় বাধা।

সম্প্রতি হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনা ও এর অন্তর্নিহিত সতর্কবার্তার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য, লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সমাবেশ প্রতিহত করা। মূলত ইরানের ওপর কোনো বড় হামলার আগে অথবা কড়া পাহারায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মার্কিন চেষ্টাকে আটকে দিতেই এ কৌশল নিয়েছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্র অতীতে বহুবার হুতির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মাঝ–আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে এবং আগামী দিনেও সেই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এরপরও ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় ধরনের কোনো সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলে হুতিদের এ অব্যাহত হুমকি মার্কিন বাহিনীর সমরপ্রস্তুতি ও সৈন্যসমাবেশের গতি বেশ খানিকটা মন্থর করে দিতে পারবে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের কাছে হুতিবিরোধী ইয়েমেনি একটি সূত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে। সেই সূত্রের ভাষ্যমতে, সংঘাতের পেছনের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে সৌদি আরবের পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে বয়ে যাওয়া তেলের বিশাল পাইপলাইন (ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন)।

লোহিত সাগর দিয়ে নিজেদের তেল পরিবহনের এ ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন গতকাল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। ইরাক থেকে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর ড্রোন হামলার পর তারা তেল রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ এ পাইপলাইন বন্ধ করে দিল। পাইপলাইনটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। ইউরোপে জ্বালানি তেলের জোগান স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রেও এ পাইপলাইনের ভূমিকা অনেক।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় হুতিদের কড়া জবাব দিতে এবং নিজেদের রণতরিগুলো ঝুঁকিমুক্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।

এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে হুতিদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করতে পারে ইসরায়েল। এর মধ্য দিয়ে পুরো যুদ্ধের মানচিত্রে খুলে যেতে পারে নতুন আরেকটি বিপজ্জনক রণাঙ্গন। তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এমন সম্ভাব্য একটি পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আগেভাগে নিজেদের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে।

পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণে সৌদি আরবের ইস্ট–ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। স্যাটেলাইটে এ দৃশ্য ধরা পড়েছে। হিজাজ অঞ্চল, সৌদি আরব। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণে সৌদি আরবের ইস্ট–ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। স্যাটেলাইটে এ দৃশ্য ধরা পড়েছে। হিজাজ অঞ্চল, সৌদি আরব। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ছবি: রয়টার্স হুতিদের কাছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের কাছে সম্প্রতি নিজেদের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার, সামরিক উপদেষ্টা, মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন–সংক্রান্ত সরঞ্জাম পাঠিয়েছে ইরান।

১৩ জুলাই তেহরান থেকে মাহান এয়ারের একটি ফ্লাইটে আইআরজিসির সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম ইয়েমেনে পৌঁছায়। এসব বিষয়ে জানাশোনা আছে, এমন চারটি সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

চারটি সূত্রের মধ্যে দুজন ইরানি কর্মকর্তা, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিক মহল স্বীকৃত সরকারের তথ্যমন্ত্রী এবং একজন আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক রয়েছেন। তাঁদের ভাষ্যমতে, লোহিত সাগরে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে তেহরান এ পদক্ষেপ নিয়েছে।

এ পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরান তার মিত্র হুতিদের এমনভাবে শক্তিশালী করতে চাইছে, যাতে তারা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে আরও কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বাব আল–মানদেব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মধ্য দিয়ে হুতিরা ইরানের এ লক্ষ্য আপাতত ভালোভাবেই পূরণ করেছে বলে মনে হচ্ছে।

জাহাজ–বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোটের সাহায্যে বড় আকারের নৌযানের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। তা ছাড়া সাগরের বুকে মাইন পেতে রেখে বাব আল–মানদেব প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচলও তারা প্রবলভাবে বিঘ্নিত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র কেন পিছু হটল ২০২৫ সালের বসন্তে লোহিত সাগর যুক্তরাষ্ট্র ও ইয়েমেনের হুতিদের মধ্যে একটা উত্তেজনাকর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষশক্তি’র অংশ হিসেবে হুতিরা আন্তর্জাতিক জাহাজে তাদের হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছিল।

পরিস্থিতি মোকবিলায় হুতিদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ নামে বড় সামরিক অভিযান শুরু করেন। এর খরচ হয় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার।

এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল, হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, ড্রোন ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয় ও আধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহারের পরও এ অভিযান কৌশলগত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। হুতিদের সামরিক সক্ষমতার ওপর এ অভিযানের তেমন কোনো প্রভাবই পড়েনি। অভিযানে ইয়েমেনে আট শতাধিক স্থানে হামলা চালানো হয়েছিল।

ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ও ইরানের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে হুতিরা যে শুধু এ সময় টিকেই ছিল, তা নয়; বরং বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজের ওপর হামলা আরও বাড়িয়ে দেয়। হুতিদের এ আক্রমণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক আধিপত্যের ওপর বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। হুতিরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। এমনকি মার্কিন যুদ্ধজাহাজও বারবার হুতিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

যাহোক, মার্কিন অভিযান শুরুর দুই মাসের মাথায় ওই বছরের ৬ মে ট্রাম্প অপ্রত্যাশিতভাবে ইসরায়েলকে এড়িয়ে হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইয়েমেন সংঘাত কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের এ ব্যর্থতার একটি প্রধান কারণ, দেশটি লোহিত সাগর সংকটকে পুরোপুরি সামরিক কৌশল দিয়ে মোকাবিলা করতে চেয়েছে। কিন্তু শুধু সামরিক পদক্ষেপ দিয়ে এর সমাধান সম্ভব নয়। কারণ, এ সংকটের শিকড় রয়েছে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের মধ্যে।

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের অভাবও যুক্তরাষ্ট্রের এ ব্যর্থতাকে আরও গভীর করেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা ও অভিযান পরিচালনার অব্যবস্থাপনাও এ ব্যর্থতার জন্য দায়ী। মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা ভুলবশত সিগন্যাল অ্যাপে ফাঁস হয়ে যায়। এটি সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটা বড় দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে একটি সাঁজোয়া যানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সদস্যরা। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে একটি সাঁজোয়া যানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সদস্যরা। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ছবি: রয়টার্স হুতিরা আরও শক্তিশালী আগেই বলা হয়েছে, গত বছর ৬ মে ট্রাম্প হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দেন। সে সময় তিনি বলেন, মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধের শর্তে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে বোমা হামলা বন্ধ করবে।

ওমানের মধ্যস্থতায় হওয়া এ চুক্তিকে প্রথমে উত্তেজনা প্রশমনের একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। কিন্তু দ্রুতই এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরাজয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। হুতিরা মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধ করলেও ইসরায়েলের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে। এটি চুক্তির সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে। প্রধান মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ের ঘাটতিকেও খোলাসা করে এটি।

ইসরায়েল ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পাশ কাটিয়ে চুক্তির ঘোষণাটি ছিল নির্দিষ্টভাবেই বিস্ময়কর। এ সম্পর্কে ইসরায়েল একেবারেই কিছু জানত না। হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্রে তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইসরায়েল পাল্টা জবাব হিসেবে ইয়েমেনের হোদেইদা বন্দর ও সানা বিমানবন্দরে হামলা চালায়।

ট্রাম্প এ চুক্তিকে ইয়েমেন সংকটের অন্ধগলি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বের হয়ে আসা হিসেবে চিত্রিত করলেও জোর দিয়ে বলেন, এ সংঘাত এখনই শেষ হচ্ছে না।

হুতি নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতিও চুক্তিটিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল এক পরাজয়’ বলে অভিহিত করেন এবং এটিকে তাঁদের বিজয় হিসেবে চিত্রিত করেন। দ্য ইকোনমিস্ট এটিকে ‘আত্মা বিক্রির চুক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে। পত্রিকাটি বলেছে, এর মধ্য দিয়ে ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে।

বিশ্লেষকেরা বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে হুতিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত ব্যর্থতার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ হয়ে থাকবে। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। অন্যদিকে হুতিরা আরও শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।

এর আগে ট্রাম্পের পূর্বসুরি বাইডেনের আমলে হুতিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’ অভিযানও হয়েছে ব্যর্থ।

সৌদি যুবরাজের ফোন, ট্রাম্পের না হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়ে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার অন্তত দুবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোন করেছেন।

তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্র দুটি জানায়, ওয়াশিংটন রিয়াদকে বলেছে, আপাতত তারা হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয়। তবে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করবে।

দুই নেতার মধ্যে কোনো ফোনালাপ হয়েছে কি না, রয়টার্সের এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউস।

{তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা, রয়টার্স, ওয়াই নেট গ্লোবাল ও মিডল ইস্ট মনিটর}